×

উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রধান নির্বাহীর হতাশা

  • প্রকাশিত সময় : শনিবার, ৮ জুলাই, ২০২৩
  • ৯৭ পড়েছেন

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে দেখা যায়, জাতিকে নসিহত করিবার মতো লোকের অভাব নাই। তাহারা এত ভালো ভালো কথা বলেন, কিন্তু গ্রাউন্ডে তথা মাঠ পর্যায়ে গিয়া দেখা যায়, তাহাদের সেই কথার কানাকড়ি মূল্য নাই। কেন ইতিবাচক কথাবার্তা এইভাবে নেতিবাচক হিসাবে পরিবর্তিত হয়, তাহা ভাবিবার বিষয়ই বটে। এই সকল দেশে কেহ একবার ভাবিয়া দেখেন না, যদি দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহা হইলে সমস্যা কোথায়? আমরা সবকিছু দেখি, শুনি এবং লিখিয়াও থাকি। এই সকল দেশের বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজসহ সকলেই স্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে বলিয়া দাবি করা হয়। কিন্তু এই কথা কতটা সত্য? যে কোনো নির্বাচনে হারজিত আছে। এমনকি যেই সকল উন্নত দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, যেই দেশের ভোটাররা শিক্ষিত, অর্থবিত্তে স্বাবলম্বী ও সচেতন, সেই সকল দেশেও দেখা যায় অর্ধেক লোকই ভোট দেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোট পড়ে ৪০ শতাংশেরও কম। সেই জন্য কথা বলা ও মতামত দেওয়ার সময় লাগাম টানিয়া রাখাটাই কি উত্তম নহে? যাহারা সুষ্ঠুভাবে সবকিছু হইবার কথা বলেন, তাহারা কি জানেন না উন্নয়নশীল বিশ্বে কীভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা হয়? মামলা-হামলা কীভাবে করিতে হয় সেই ব্যাপারেও তাহারা সিদ্ধহস্ত। তাহা ছাড়া এই সকল দেশে প্লেগের মতো সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িয়াছে দুর্নীতি। সেইখানে কে যে কাহার কথা অনুযায়ী কলকাঠি নাড়িতেছে, তাহা কেহ জানেন না। কথায় বলে অর্থই অনর্থের মূল। কিন্তু তাহার পরও এই সকল দেশে পরিবর্তন যে আসে না, তাহা নহে। অন্যায়- অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদির কারণে যাহারা ক্ষতিগ্রস্ত হন, অত্যাচার-অবিচারে অতিষ্ঠ হইয়া পড়েন, তাহারা সর্বদা কামনা করেন দেশে দ্রুত পরিবর্তন আসুক। তবে দ্রুত পরিবর্তন আসিবার কথা বলা ও কামনা করা যতটা সহজ, বাস্তবে তাহার প্রতিফলন ঘটানো তত সহজ নহে। এই জগতে সৃষ্টিকর্তাও কোনো দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন না। মানুষ পুঙ্খানুপুঙ্খ কোনো অন্যায়ের বিচার করিতে পারে না বলিয়া শেষ বিচারে তিনিই ভরসা। দেরিতে হইলেও, পরকালে তো বটে, অনেক সময় এই পৃথিবীতেও সুবিচারের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন তিনি। এই জন্য তিনি বারংবার আমাদের ধৈর্য ধারণ করিতে বলিয়াছেন এবং তিনি ধৈর্যশীলদের পছন্দ করিয়া থাকেন। সবুরে মেওয়া ফলে এই কথাটি নিরর্থক নহে। তাই অন্যায় করিয়া কেহ পার পাইবে না, এই বিশ্বাস আমাদের অন্তঃকরণে রাখিতে হইবে। যুগে যুগে দেশে দেশে বহু স্বৈরশাসক আসিয়াছেন। তাহারা মানুষকে সকল ধরনের অধিকার হইতে বঞ্চিত রাখিয়াছেন। দেশ ও প্রশাসন চালাইয়াছেন কঠোরহস্তে এবং ইহার যুক্তিস্বরূপ বলিয়াছেন, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার স্বার্থেই এইরূপ করা হইয়াছে। সেই সকল দেশেও শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন ঘটিয়াছে। পাকিস্তানের লৌহমানব আইয়ুব খান, ইরানের রেজা শাহ, ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস, দক্ষিণ কোরিয়ার চুন দু হুয়ান প্রমুখ সকলেই দাবি করিয়াছেন, তাহাদের সময় দেশে প্রভূত উন্নয়ন হইয়াছে। নির্লিপ্তভাবে তাহা মানিয়া লইতে হয়। কিন্তু এমন কী হইল যে, তিন দিনের মধ্যে সকল খেল খতম। তখন হয়তো কেহ ব্যথিত হৃদয়ে বলিতে পারেন, দেশ ও দশের জন্য তাহারা এত কিছু করিলেন, তাহার পরেও তাহাদের কেন এই পরিণতি? ইহার আগ পর্যন্ত এই সকল শাসক মনেপ্রাণে বিশ্বাস করিতেন, উন্নয়নের কারণে জনগণ তাহাদের সহিত সম্মুখে, পার্শ্বে ও পশ্চাতে রহিয়াছে। ইহার চাইতেও দুঃখজনক বিষয় হইল, এই সকল উন্নয়নশীল দেশে প্রতিটি সরকারের পটপরিবর্তনের পূর্বে বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, আইনের শাসন ইত্যাদি সুন্দর সুন্দর কথা বলা হয়। কিন্তু পরিবর্তনের পর দেখা যায়, যেই লাউ সেই কদু। বরং অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি, হতাশা ইত্যাদি আগের তুলনায় বহু গুণ বৃদ্ধি পাইবার কারণে অনেকে তখন স্বগতোক্তি করিতে থাকেন যে, আগের জমানাই ভালো ছিল। এই সকল দেশে প্রশাসন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা ব্যক্তিরা এমনভাবে সরকারের তোষামোদি করেন, যাহাতে সরকারপ্রধানসহ মন্ত্রীরা আত্মতৃপ্তিতে ভুগিতে থাকেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন আসিয়া দেখেন, তাহাদের চারিপার্শ্বে কেহ নাই। অনেকে ইহার কারণ বিশ্লেষণের সময় পান, অনেকে পান না। সিরাজউদ্দৌলাহর পতনের পর তৃণমূলের একজন নাগরিক সকল শুনিয়া যেই কথা বলিয়াছিলেন, তাহা এখানে প্রণিধানযোগ্য: হুজুরের যে এত ভালো করার ইচ্ছা ছিল তা আগে জানতুম না। কেননা উন্নয়ন কোন পর্যন্ত পৌছাইয়াছে ইহাও বিবেচনার বিষয়। দেশের প্রধান নির্বাহী উন্নয়নে বরাদ্দ দিয়া যাইতেছেন ঠিকই। কিন্তু সেই উন্নয়ন প্রকল্প কতটা বাস্তবায়িত হইতেছে? সত্যি কোনো কিছুর দায়িত্বে না থাকিলে মুখে যত বড় বড় কথা, বলা যায়, দায়িত্বে থাকিলে তাহা সম্ভব হয় না। তখন হতাশ হইয়া কান্না ছাড়া আর কিছুই করিবার থাকে না। এই কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রধান নির্বাহীর হতাশা উপলব্ধি করাটাও কঠিন বইকি!

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর

ওয়েবসাইট ডিজাইন প্রযুক্তি সহায়তায়: BD IT SEBA