মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৫:০৯ অপরাহ্ন

নগরীর হাজী মহসীন রোডে অবৈধভাবে ভবন নির্মানের অভিযোগ : বাঁধা দেওয়ায় কেডিএ কর্মকর্তাদের হয়রানির চেষ্টা

মো. শহীদুল হাসান :
  • প্রকাশিত সময় : মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৩
  • ২০০ পড়েছেন

খুলনা নগরীর হাজী মহসিন রোডের এ্যাড. আবুল হোসেন ও তার পরিবার খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) বৈধ অনুমতি ও নকশা ছাড়াই দোতলা ভবন নির্মাণ করেছেন। এমনকি আদালতে মামলা থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে দেয়াল নির্মান করে বন্ধ করে দিয়েছেন প্রতিবেশি রোকেয়া বানুর একমাত্র চলাচলের রাস্তাটিও।অভিযোগ পেয়ে কেডিএ কর্তৃপক্ষ সরেজমিন পরিদর্শন শেষে অথরাইজড শাখা থেকে বার বার অননুমোদিত অবৈধ ভবন নির্মাণ বন্ধ ও স্থাপনা অপসারণে নোটিশ দেয়া হয়। কিন্তু তিনি তা উপেক্ষা করে নির্মাণ কাজ অব্যাহত রেখেছেন। যা কেডিএ আইন ও ভবন নীতিমালার পরিপন্থী। সবশেষ গত ১৭ অক্টোবর কেডিএর চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিরাজুল ইসলামের পক্ষে থেকে ভবন নির্মাণকারী এ্যাড. আবুল হোসেনকে অননুমোদিত ভবন নির্মাণ কাজ অনতিবিলম্বে বন্ধ রাখা এবং অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করার ব্যাখ্যাসহ নোটিশ দেয়া হয়েছে। অন্যথায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও নোটিশে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে নোটিশ দেয়ার ২ মাস অতিবাহিত হলেও এ্যাড. আবুল হোসেন ও তার পরিবার অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করেননি। উল্টো কেডিএর পরিকল্পিত নগরায়ন ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণ কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্থ করতে এ্যাড. আবুল হোসেন ও তার পরিবার বিভিন্ন দপ্তরে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছেন। এমনকি বানোয়াট অভিযোগ তুলে কেডিএ কর্তৃপক্ষকে হয়রানি করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছ। তবে নাগরিক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বলছেন, নগরীকে সুশৃঙ্খল ও পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তুলতে অননুমোদিত এসব অবৈধ ভবন ও স্থাপনা নির্মানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত।  

কেডিএ’র অথরাইজড শাখা সূত্র জানা গেছে, নগরীর হাজি মো. মহসিন রোডের বাসিন্দা এ্যাড. আবুল হোসেন খুলনার সদর থানার টুটপাড়া মৌজার আর এস দাগ নং ১৬৩৬, ১৬৩৪ (অংশ) এর উপর বাড়ী নির্মাণের জন্য কেডিএ বরাবর নো অবজেকশন সার্টিফিকেটি (এনওসি) এর জন্য আবেদন করেন। কেডিএ কর্তৃক ইমরাত নির্মাণ আইন অনুযায়ী যথাযথ শর্ত পূরণ না হওয়ায় এ্যাড. আবুল হোসনকে তার ভবন নির্মাণের এনওসি প্রদান করেনি। পরবর্তীতে এ্যাড. আবুল হোসেন কেডিএর অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিন পরিদর্শন করে কেডিএ গত ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর এ্যাড. আবুল হোসেনকে অননুমোদিত ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখা ও অননুমোদিত নির্মাণ কাজ কেন ভেঙ্গে ফেলা হবে না সে সম্পর্কে কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদান করে। নোটিশের জবাবে এ্যাড. আবুল হোসেন জানান, কেডিএর কর্মকর্তা টাউন প্লানার তানভীর হোসেন তাকে মৌখিক অনুমোদন দিয়েছেন। সেভাবেই তিনি ভবন নির্মাণ করছেন। পরে কেডিএ কর্তৃপক্ষ আবারও অনুমোদনবিহীন ভবন নির্মাণ বন্ধ না করায় স্ব শরীরে হাজির হয়ে বক্তব্য প্রদানের নোটিশ প্রদান করেন। নোটিশ প্রদানের পর আবুল হোসেন ও তার পরিবার কেডিএর নিকট একটি লিখিত জবাব দাখিল করে। একই সাথে কেডিএর চেয়ারম্যানসহ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে মনগড়া, বানোয়াট ও মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে হয়রানির চেষ্টা করছেন। পরবর্তীতে গত ১৭ অক্টোবর কেডিএর চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিরাজুল ইসলামের পক্ষে থেকে এ্যাড. আবুল হোসেন ও তার পরিবারের জবাবের ভিত্তিতে ব্যাখ্যাসহ পূনরায় নোটিশ প্রদান করে। নোটিশে কেডিএ চেয়াম্যান বলেন, টাউন প্লানার তানভীর হোসেন তাকে মৌখিক অনুমোদন দিয়েছেন বলে এ্যাড. আবুল হোসেন যে জবাব দিয়েছেন, তা সঠিক নয়। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ১৯৯৬ অনুসরণ না করায় তার উক্ত জবাব কেডিএ কর্তৃক গৃহীত হয়নি। এছাড়া গত ২০২২ সালে ১৮ ডিসেম্বর সাইট ও সাইট সংলগ্ন অননুমোদিতভাবে নির্মিত অন্যান্য ভবন মালিকদের নিয়ে সমন্বয় সভা করা হয়। সভায় ১৯৯৬ সালে ভবন নির্মাণ নীতিমালার বাধ্যবাধকতার বিষয়ে সবাইকে অবহিত করা হয়। এবং সে অনুযায়ী সবাইকে ভবন নির্মাণের পরামর্শ দেওয়া হয়। এমনকি যাদের অনুমোদিত নকশা রয়েছে তাদেরকে সেটব্যাক মেনে ভবন নির্মাণ এবং যাদের অনুমোদন নেই তাদেরকে এনওসি গ্রহণ করে নকশার অনুমোদন নিয়ে ভবন নির্মাণের পরামর্শ দেয়া হয়। পরবর্তীতে কেডিএ কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণ বিধিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে অনুমোদন না নিয়ে ভবন নির্মাণ করায় সংশ্লিষ্ট সকলকে নোটিশ প্রদান করা হয় এবং এই বিষয়ে ধারাবাহিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কিন্তু অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন অননুমোদিত ভবনের শর্ট কলাম নির্মাণ কাজ চলমান রাখায় অননুমোদিত নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার পরামর্শ প্রদান করে নোটিশ দেয়া হয়। কিন্তু পুনরায় সাইট পরিদর্শন করলে দেখা যায়, আবুল হোসেন কেডিএর পরামর্শ অগ্রাহ্য করে অননুমোদিত নির্মাণ কাজ অব্যাহত রেখেছে। এবং প্রথম তলার ছাদ ঢালাই সম্পূর্ণ করেছে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নিকট হতে এ ধরনের আচরণ কাম্য নয় এবং বিষয়টি অনাকাঙ্খিত। এ বিষয়গুলি অবহিত করে গত ২০ সেপ্টেম্বর এডভোকেট আবুল হোসেনের বক্তব্য গ্রহণের জন্য চিঠি দেয়া হলে তার ছেলে রাজিব ইমতিয়াজ পরাগ ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর দেওয়া নোটিশের জবাব পূনরায় উপস্থাপন করেন। যা কেডিএ কর্তৃপক্ষের বোধগম্য নয়। পরবর্তীতে অ্যাডভোকেট আবুল হোসেনকে অননুমোদিত ভবন নির্মাণ কাজ অনতিবিলম্বে বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়। সেই সাথে ইমারত নির্মাণ বিধিমালার আলোকে জমি সংলগ্ন বিদ্যমান রাস্তার প্রস্থ বধ্যগলি হিসেবে পুনরায় ১০ ফুট নিশ্চিত করে কেডিএ হতে ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র গ্রহণ করার অনুরোধ করা হয়। ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্রের সাথে জমিতে নির্মিতব্য ইমারতের সামনে ৪ ফেুট ১১ ইঞ্চি, পিছনে ৩ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং দুই পাশে ২ ফুট সাড়ে ৭ ইঞ্চি ফাঁকা জায়গা নিশ্চিত করে প্রস্তুত নকশা দাখিল করে কেডিএ থেকে অনুমতি নিয়ে ইমারত নির্মাণ করার অনুরোধ করা হয়। সেই সাথে বিধিমালা অনুযায়ী ইমারত নির্মাণ করা না হলে এ্যাডভোকেট আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও নোটিশে জানানো হয়। এরপরেও এ্যাড. আবুল হোসেন ও তার পরিবার অননুমোদিত ভবন অপসারণ ও রাস্তা উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা না নিয়ে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলে কেডিএ কর্তৃপক্ষকে নানাভাবে হয়রানির অপচেষ্টা করছে। এধরণের কর্মকান্ড পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল নগরী গড়ার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক।

ভবন মালিক এ্যাড. আবুল হোসেন জানান, তিনি খুলনার বাড়ীতে থাকেন না-বাগেরহাটে থাকেন। খুলনায় তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েরা থাকেন। সেখানে অবৈধভাবে কোন স্থাপনা করা হয়নি। আশেপাশের জমির মালিকেরা যেভাবে ভবন নির্মাণ করেছেন আমিও সেভাবে ভবন নির্মাণ করেছি। তবে কেডিএর অনুমোদনের বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে পাশ্ববর্তী জমির মালিক রোকেয়া বানু বাদী হয়ে খুলনার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছেন বলে জানান। মামলায় যে রায় হবে সেটা তিনি মেনে নিবেন বলেও জানান।

ভবন মালিক এ্যাড. আবুল হোসেনের ছেলে রাজিব ইমতিয়াজ পরাগ জানান, আমাদের আশেপাশের অনেকেই অনেক বিল্ডিং করেছেন তাদের কেডিএর অনুমোদন নেই। আমাদের ভবনের কেন কেডিএর অনুমোদন দরকার হবে? আমাদের বাড়িতে যাতায়াতে তো ৬ ফুট রাস্তা রয়েছে। কিন্তু আমার জানা মতে ৪ ফিট রাস্তা রয়েছে এমন বেশকিছু বাড়িতে কেডিএ অনুমতি দিয়েছে। যার মধ্যে দুটি ট্রাঙ্ক রোডে এবং একটি গগণ বাবু রোডে রয়েছে বলে জানি।আমি সেগুলিকে দেখাতে পারবো। তবে তাদের ভবন নির্মাণে কেডিএর অনুমোদন আছে কিনা জানতে চাইলে খুলনার সিটি মেয়র তাদের আত্মীয় বলে তিনি পরিচয় দেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য একটি পক্ষ আমাদের হয়রানি করছে। তবে আমরা কাউকে ছাড় দিব না। কেডিএর কাজ কেডিএ করবে তবে যারা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে আসবে তাদেরকে ছাড় দেয়া হবে না। কেডিএর লোকজন হিংসার বশীভূত হয়ে আমাদেরকে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়নি। কেডিএর দুজন কর্মচারী ওভারশিয়ার মুজাহিদ এবং পরিদর্শক আব্দুল হান্নান এসব করাচ্ছে যাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে আমরা দুদকে অভিযোগ জানিয়েছি।

এ বিষয়ে খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফুজ্জামান জানান, মহানগরীকে সুশৃঙ্খল ও পরিবেশ বান্ধব করার জন্য কেডিএ কাজ করছে। কেডিএর অনুমোদন ছাড়া কোন ভবন বা স্থাপনা নির্মাণ অবৈধ ও আইন পরিপন্থী অনুমোদনবিহীন ও নকশা বহির্ভূত সকল স্থাপনা উচ্ছেদে কেডিএ কর্তৃপক্ষের যথাযথ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কেডিএ নীতিমালার কোন ব্যাত্যয় ঘটলে সে যেই হোক তার বিরুদ্ধে স্থাপনা উচ্ছেদ, জরিমান ও যথাযথ আইনানূগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) খুলনা এর সভাপতি এ্যাড. কুতরত-ই-খুদা জানান, কেডিএর অনুমতি না নিয়ে কেউ ভবন নির্মাণ করলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। শুধু নোটিশ দিয়েই কেডিএ তার কাজ শেষ করলে হবে না। কেডিএর নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেটসহ জনবল রয়েছে। যার মাধ্যমে কেডিএ জরিমানা এবং উচ্ছেদ অভিযান চালাতে পারে। এখানে যেই হোক তাকে ছাড় দেয়া যাবে না। কেউ ছাড় পেয়ে গেলে অন্যরা অবৈধভাবে ভবন নির্মাণে উৎসাহিত হবে। তাই কেডিএর উচিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব অবৈধ অননুমোদিত ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অন্যথায় সুশৃঙ্খল ও পরিবেশ বান্ধব নগরী গড়ার যে উদ্দেশ্য তা ব্যাহত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এধরনের আরো সংবাদ

Categories

© All rights reserved © 2019 LatestNews
Hwowlljksf788wf-Iu