বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন

খুলনায় বিএনপি নেতার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ : জমি ফিরে পেলো হ্যানে রেলওয়ে প্রাথঃ বিদ্যালয়

দেশ প্রতিবেদক :
  • প্রকাশিত সময় : বুধবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪
  • ৩৬৪ পড়েছেন

অবশেষে অবৈধ দখলদার থেকে অবমুক্ত হলো খুলনা রেলওয়ের জায়গা। গত ডিসেম্বর মাসে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে খুলনার হ্যানে রেলওয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে দখল বুঝিয়ে দেয় প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও রেল কর্তৃপক্ষ। এক যুগেরও বেশী সময় ধরে বিদ্যালয়ের জমিতে ভবন নির্মাণ করে দখল করে রাখে আওয়ামী লীগ নেতার ছত্রছায়ায় থাকা বিএনপি’র এক নেতা। প্রাথমিক শিক্ষা ও রেল কর্তৃপক্ষ বারবার চেষ্টা করে অবশেষে উচ্ছেদ করে সদর থানা বিএনপি’র ওই নেতার দখলে থাকা জমি। ভরসা ছিলো বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসছে আর তাকে কেউ ওই অবৈধ স্থাপনা থেকে সরাতে পারবে না। অনেকের কাছে ধর্ণা দিয়েও শেষ রক্ষা পায়নি বিএনপি’র ওই নেতা। এখন দোষছেন আওয়ামী লীগের সেই সেল্টারদাতাকে। তবে অবৈধ দখলে থাকা বিদ্যালয়ের পিছনে অংশের জায়গা এখনও উদ্ধার করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন বিএনপি নেতার দখলকৃত বাকী স্থাপনা অপসারণ না করা হলে সীমানা প্রাচীরের কাজ সম্পূর্ণ করা যাচ্ছে না। ফলে স্কুল যেমন অরক্ষিত থাকছে তেমনি, চরম নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। দ্রুত বিএনপি নেতার দখলকৃত সম্পূর্ণ জমি উদ্ধার করে স্কুলের সীমানা প্রাচীরের কাজ সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছে তারা। আর নাগরিক নেতারা বলছেন বিএনপি নেতার অবৈধ দখল থাকা সরকারী স্কুলের জায়গা সম্পূর্ণ উদ্ধার করতে না পারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাই স্পষ্ট পরিলক্ষিত হচ্ছে।

মঙ্গলবার (৬ ফেব্রুয়ারী) সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, খুলনা সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরিদ আহমেদ মোল্লার অবৈধ দখলে থাকা স্কুলের জায়গায় গড়ে তোলা ভবনের কিছু অংশ ভেঙে অপসারণ করা হয়েছে। তবে স্কুলের জমিতে অবৈধভাবে গড়ে তোলা ভবনের আরো কিছু স্থাপনা রয়ে গেছে। ঐসব স্থাপনার কারণে সীমানা প্রাচীরের নির্মান কাজ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পিছনের উত্তর পশ্চিম কোনে অবৈধ স্থাপনা থাকায় সীমানা প্রাচীর সোজাভাবে নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি বলে কাজ বন্ধ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হ্যানে রেলওয়ে সরকারী প্রাইমারী স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক ও অভিভাবক জানান, প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিএনপি নেতা ফরিদ আহমেদ মোল্লা বিদ্যালয়টির জমি অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ করে দখল করে রেখেছিলো। এলাকাবাসীর বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগের প্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ ফরিদ মোল্লার অবৈধ দখলে থাকা স্কুলের জায়গায় গড়ে তোলা ভবনের কিছু অংশ ভেঙে অপসারণ করেছে। তবে স্কুলের জমিতে অবৈধভাবে গড়ে তোলা ভবনের আরো কিছু অংশ রয়ে গেছে। ঐসব স্থাপনার কারণে সীমানা প্রাচীরের নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। সীমানা প্রাচীরের কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় স্কুল যেমন অরক্ষিত থাকছে তেমনি, বখাটেদের অবাধ চলাফেরার কারণে চরম নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। দ্রুত বিএনপি নেতার দখলকৃত সম্পূর্ণ জমি উদ্ধার করে স্কুলের সীমানা প্রাচীরের কাজ সম্পন্ন করে স্কুলকে সুরক্ষিত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে স্কুলের সীমানা প্রাচীর নির্মাণকারী ঠিকাদার মো. মুজিবুর রহমান জানান, স্কুল কর্তৃপক্ষ বলেছে সেভাবেই সীমানা প্রাচীরের কাজ করা হয়েছে। তবে সীমানা জটিলতার কারণে একাংশে প্রাচীর বাঁকা করে নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণ কাজ ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সীমানা জটিলতার কারণে দেরী হচ্ছে।

খুলনা সদর থানা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শাহজাহান জানান, হ্যানে রেলওয়ে সরকারী প্রাইমারী স্কুল জমি অবৈধ দখলে থাকা অংশের স্থাপনা ভেঙে উচ্ছেদ করা হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিবৃন্দ যৌথভাবে সরেজমিনে দেখে ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে। স্কুলের জমি দখলে নেয়া ব্যক্তির বাসভবনের যাতায়াতের গেটটিও বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দ্রুতই সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান।

সচেতন নাগরিক সমাজ (সনাক) খুলনার সভাপতি এ্যাড. কুদরত-ই-খুদা জানান, একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জায়গা কেউ দখল করে রাখবে এটা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবৈধ থাকা জমি আংশিক উদ্ধার করেছে। জমি সম্পূর্ণ উদ্ধার করতে বিষয়টির সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এখানে বিএনপি নেতার অবৈধ দখল থাকা সরকারী স্কুলের জায়গা সম্পূর্ণ উদ্ধার করতে না পারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা স্পষ্ট পরিলক্ষিত হচ্ছে।

উল্লেখ্য, নগরীর সদর থানার ২১নং ওয়ার্ডের স্টেশন রোডে ১৯১০ সালে হ্যানে রেলওয়ে সরকারী প্রাইমারী স্কুল বাংলাদেশ রেলওয়ের ৩৬.৫ শতক জমি বরাদ্দ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্কুলের জমির মধ্যে একটি ভবন নির্মাণ করে স্কুলের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু একতলা ভবনটি ব্যবহার অযোগ্য হওয়ায় সরকারীভাবে ১৯৯২ সালে নতুন একটি তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। পুরাতন ভবনের পূর্ব পাশের প্রায় ২ শতক জমি বিএনপি নেতা মোল্লা ফরিদ আহম্মেদ পরিবার অবৈধভাবে দখল করে নিজের পাকা বসতবাড়ী নির্মাণ করে। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিএনপি নেতা ও তার স্ত্রী স্কুলের জমিতে বাড়ি করে দখল করে রাখেন। তিনি ২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়টির সভাপতি থাকায় অবৈধ দখল পাকাপোক্ত করেন। সে সময়ে বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনটিও তার দখলে ছিলো। যেটাকে তিনি নিজের রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবেও দীর্ঘদিন ব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তার বাড়ী থেকে বের হওয়ার বিকল্প রাস্তা থাকলেও বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভিতর দিয়ে তিনি ও তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজনসহ দলীয় নেতাকর্মীরা সরকার বিরোধী মিছিল-মিটিং ও সমাবেশের লোকজন নিয়ে অহরহ চলাচল করে থাকে। এতে করে বিদ্যালয়টির পাঠদান যেমন ক্ষতি হচ্ছে তেমনি অরক্ষিত হয়ে পড়েছে বিদ্যালয়টির নিরপত্তাও। স্কুল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে ফরিদ আহমেদকে মৌখিকভাবে বিভিন্ন সময় একাধিকবার বললেও তিনি কর্ণপাত না করে জমি দখলে রাখেন।

বিএনপি নেতা ফরিদ আহমেদ মোল্লা যে বাড়িটিতে বসবাস করেন তা তিনি ও তার স্ত্রী তাহমিনা আহম্মেদ রেলওয়ের নিকট থেকে বাণিজ্যিক প্লট হিসেবে বরাদ্দ নিয়েছেন। ফরিদ মোল্লা রেলওয়ের পাকশি স্টেট বিভাগের জ ১নং ৩২৯২৫৫ লাইসেন্স মোতাবেক বাৎসরিক ১৬ হাজার ৮শত টাকায় ২০০ বর্গফুট এবং স্ত্রী তাহমিনা আহমেদ রেলওয়ের পাকশি স্টেট বিভাগের জ ১নং ৩২৯২৫০ লাইসেন্স মোতাবেক বাৎসরিক ২৮ হাজার ৫৬০ টাকায় ৩৪০ বর্গফুট জায়গা বাণিজ্যিক প্লট হিসেবে বরাদ্দ নিয়েছেন। কিন্তু বরাদ্দের নিয়মনীতি না মেনে তারা অবৈধভাবে ছাদসহ বাড়ী নির্মাণ করে বসবাস করছে। যা রেলওয়ে ভূ-সম্পত্তি বিভাগের আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ। তাদের বরাদ্দ নেয়া জমি ছাড়াও তারা হ্যানে রেলওয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জায়গা অবৈধ দখল করে বসতবাড়ী নির্মাণ করেছেন। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা একাধিকবার স্কুলের দখলকৃত জায়গা ছেড়ে দেয়া ও রেলওয়ের নিয়ম না মেনে নির্মাণ করা ভবন অপসারণের নোটিশ দিলেও তিনি ক্ষমতা ও সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রভাব খাটিয়ে তা দখল রাখেন। ##

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এধরনের আরো সংবাদ

Categories

© All rights reserved © 2019 LatestNews
Hwowlljksf788wf-Iu